Speaker A
আপনি কি জানেন মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতাকে আটকে রাখে তার নিজের নিয়ন্ত্রণহীন মন? আপনি যতই চেষ্টা করুন, যদি নিজের চিন্তা, আবেগ আর সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন, তাহলে জীবনের কোন ক্ষেত্রেই আপনি স্থায়ী সফলতা পাবেন না। কিন্তু সুখবর হলো সেলফ কন্ট্রোল এমন একটি শক্তি যা একবার শিখে গেলে আপনার জীবন, আপনার ভবিষ্যৎ, এমনকি আপনার প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ বদলে যেতে শুরু করে। আর ঠিক সেই জীবন বদলে দেওয়া শক্তিটাই সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলে দ্যা পাওয়ার অফ সেলফ কন্ট্রোল বইটি। আজ আপনি সময়ের ডাকের সাথে এই বইয়ের এমন সব বাস্তব শিক্ষা শুনবেন, যা আপনার জীবনকে আরো শক্তিশালী, স্থির এবং সফল করে তুলতে সাহায্য করবে। সেলফ কন্ট্রোল শুধু একটি শব্দ নয়, আপনার পুরো জীবনের দিক বদলে দেওয়ার ক্ষমতা। মানুষ জীবনে যত বড় হোক, যত সফল হোক, যত দক্ষ হোক, একটি জায়গায় হারলে সব হারিয়ে যায়। আর সেটি হলো নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ। এই বইটি খুব সহজ একটি সত্য শেখায়। আপনার জীবনকে বদলে দিতে কারো প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু আপনাকেই নিয়ন্ত্রণে আনা। জীবনে সমস্যা আসে কারণ মন সবসময় আপনাকে ভুল জায়গায় নিয়ে যেতে চায়। যেমন ধরুন কাজ করার সময় হঠাৎ মন চাইলো একটু সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করি। পড়াশোনার সময় মন চাইলো একটু বিশ্রাম নেই। রাগের সময় মন বলে উঠলো এখনই জবাব দাও। আপনি যদি মনকে অনুসরণ করেন, মন আপনাকে পথে নামিয়ে দেবে। কিন্তু আপনি যদি মনকে নিয়ন্ত্রণ করেন, মন আপনাকে সঠিক পথে পৌঁছে দেবে। এখানেই শুরু হয় সেলফ কন্ট্রোলের শক্তি। একজন মানুষের গল্প ভাবুন। সে প্রতিদিন সিদ্ধান্ত নেয় আজকে একটু ভালো হব। একটু বেশি শিখবো, একটু বেশি কাজ করব। কিন্তু সকালে উঠেই মন তাকে বলে, আজ থাক, কালকে থেকে শুরু করো। সে কালকের অপেক্ষায় থাকে আর কাল কখনো আসে না। মন তার স্বপ্নকে ধ্বংস করে দেয়। কিন্তু আরেকজন আছে যাকে এই বইয়ে বোঝানো হয়েছে। সে জানে মনকে অনুসরণ করলে জীবন নষ্ট হয়। কিন্তু মনকে নিয়ন্ত্রণ করলে জীবন গড়ে ওঠে। তাই সে মনকে বলে তুমি যা চাও আমি তা করবো না। আমি যা সঠিক সেটাই করব। এই এক সিদ্ধান্ত পুরো জীবনটাই বদলে দেয়। মানুষ ভাবে সেলফ কন্ট্রোল মানে কঠিন কিছু। কিন্তু আসলে এটি ছোট ছোট সিদ্ধান্তের সমষ্টি। যেমন রাগ এলে জবাব না দেওয়া, ভয় এলে পিছিয়ে না যাওয়া, আলসেমি এলে কাজ শুরু করা, নেশা এলে নিজেকে থামানো, ব্যর্থতা এলে দাঁড়িয়ে থাকা। এই ছোট নিয়ন্ত্রণগুলো ধীরে ধীরে মানুষকে ভিতর থেকে শক্তিশালী করে তোলে। বইটি বলে আপনি যতদিন নিজের আবেগের দাস হয়ে থাকবেন, ততদিন পৃথিবীর কোন নিয়ম, কোন পরিকল্পনা, কোন কোর্স, কোন বই আপনাকে সাহায্য করতে পারবে না। কারণ শত্রু বাইরে নয়। শত্রু আপনার নিজের ভেতরে। যেদিন আপনি শত্রুকে নিয়ন্ত্রণ করলেন, সেইদিন আপনার প্রকৃত যাত্রা শুরু হবে। আকর্ষণীয় একটি উদাহরণ বইটিতে পাওয়া যায়। একজন ট্রেডার যার সিদ্ধান্ত সবসময় আবেগ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হতো। ভয় তাকে বিক্রি করাতো, লোভ তাকে ভুল সময় কিনতে বাধ্য করত। বছর শেষে সে সব হারিয়ে ফেলতো। একদিন সে নিজের জীবন থামিয়ে একটি প্রশ্ন করল। আমি কি সত্যি সিদ্ধান্ত নিচ্ছি? নাকি আবেগ আমাকে দিয়ে সিদ্ধান্ত করাচ্ছে? সেই প্রশ্ন তাকে বদলে দেয়। সে নিজের আবেগকে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করল। রাগ এলে ৩০ সেকেন্ড চুপ থাকা। ভয় এলে গভীর শ্বাস নেওয়া, লোভ আসলে নিজের লক্ষ্য মনে করানো। এই ছোট নিয়ন্ত্রণগুলো তাকে ধীরে ধীরে নতুন জীবন দিল। বছর শেষে সে আগের জীবনের চেয়েও ভালো অবস্থায় পৌঁছে গেল। কারণ সে বাজারকে নয়, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছিল। এই বইটি বলে দুনিয়াতে দুই ধরনের মানুষ আছে। একদল তাদের জীবনের গতি নিজেদের হাতে রাখে। আরেকদল মন ও আবেগের স্রোতে ভেসে যায়। যারা নিয়ন্ত্রণ রাখে তারা জয়ী হয়। যারা ভেসে যায় তারা হারিয়ে যায়। আপনি কোন দলে থাকবেন তা নির্ধারণ করে আপনার প্রতিদিনের ছোট নিয়ন্ত্রণ। আজ একটু এগোনো, আজ একটু থামা, আজ একটু সহ্য করা, আজ একটু বুদ্ধিমত্তার সাথে থাকা। জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে সেলফ কন্ট্রোল সবচেয়ে বড় সুপার পাওয়ার। কেউ জন্ম থেকে এটি জানে না। কিন্তু সবাই শিখতে পারে। এবং একবার শিখে গেলে আপনার পরবর্তী প্রতিটি দিন আলাদা হবে। আপনার কাজ, আপনার সম্পর্ক, আপনার আর্থিক অবস্থা, আপনার ভবিষ্যৎ সবকিছুই আলাদা রূপ নেবে। আপনি যদি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে পারেন, তাহলে পৃথিবীর কেউ নেই যে আপনাকে থামাতে পারবে। সেলফ কন্ট্রোল নিয়ে মানুষ সাধারণত ভাবে এটি শুধু একটি অভ্যাস অথবা একটু শক্ত ইচ্ছাশক্তির ব্যাপার। কিন্তু সত্য কথা হলো সেলফ কন্ট্রোল হলো আপনার মনের ভেতরে থাকা অদৃশ্য স্টিয়ারিং হুইল। যে স্টিয়ারিং হুইল যার হাতে থাকে, সেই তার জীবনের দিক ঠিক করে। আর বইটি এই জায়গাটা সবচেয়ে গভীরভাবে ব্যাখ্যা করে, যেটা অনেকেই বুঝতে পারেন না। আপনার জীবন কেন আজ যেখানেই আছে, তার মূল কারণ আপনার সিদ্ধান্ত নয়, আপনার সিদ্ধান্তের পেছনের নিয়ন্ত্রণ। যেমন ধরুন দুইজন মানুষ সকাল ছয়টা বাজে উঠতে চায়। একজন উঠে পড়ে, আরেকজন উঠে পড়তে পারে না। দুজনের ইচ্ছা একই, প্ল্যান একই। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ ভিন্ন। যে নিয়ন্ত্রণে থাকে সে যেতে পারে, আর যে নিয়ন্ত্রণে থাকে না সে নিজের ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও হেরে যায়। বইটি বলে সেলফ কন্ট্রোল আসলে আপনার অভ্যন্তরীণ পরিবেশ বদলে দেয়। মানুষ ভাবে বাইরে পরিবর্তন আনলেই জীবন বদলাবে। নতুন কাজ, নতুন রুটিন, নতুন লক্ষ্য। কিন্তু ভেতরটা না বদলালে বাইরেরটা স্থায়ী হয় না। তাই একজন মানুষ অনেক প্ল্যান করে, কিন্তু কয়েকদিন পরেই ছিটকে পড়ে। কারণ ভেতরে নিয়ন্ত্রণ নেই। এখানে বইটি একটি চমৎকার ধারণা দেয়। মানুষ পরিবর্তন করে না কাজ দিয়ে, মানুষ পরিবর্তন করে পরিচয় দিয়ে। মানে আপনি যদি নিজেকে মনে প্রাণে বোঝাতে পারেন যে আপনি একজন নিয়ন্ত্রিত মানুষ, তাহলে আপনার কাজও সেই পরিচয়ের সঙ্গে মিলে যাবে। আপনি নিজের কাছে নিজেকে হারাবেন না। এখানে একটি শক্ত গল্প আসে। একজন ছাত্র ছিল যে খুব দ্রুত রেগে যেত। ছোট কথায় ভেঙে পড়তো। কেউ ভুল কিছু বললে সে পুরোদিন নষ্ট করতো। একদিন তার শিক্ষক তাকে একটি গ্লাস পানি দিলেন এবং বললেন এই গ্লাসটাকে এমনভাবে নিয়ে হাঁটবে যাতে এক ফোঁটা পানি না পড়ে। ছাত্র হাঁটতে হাঁটতে বুঝলো পানি না ফেলতে চাইলে তাকে চারপাশ না দেখে শুধু গ্লাসটার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। শিক্ষক তাকে বললেন, জীবনে সেলফ কন্ট্রোল মানে হচ্ছে বাইরের শব্দ নয়, নিজের ভেতরের গ্লাসকে ধরে রাখা। মানুষ কখন রেগে যায়? যখন বাইরে যা হচ্ছে সেটা নিজের ভেতরে ঢুকিয়ে ফেলে। মানুষ কখন ভেঙ্গে পড়ে? যখন বাইরের শব্দের কাছে নিজের স্থিরতা হারায়। এবং মানুষ কখন জিতে যায়? যখন সে ভেতরের পানিটা না ফেলতে শেখে। বইটি আরো বলে সেলফ কন্ট্রোল শুধু খারাপ অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং নিজের ভেতরের শান্তিকে রক্ষা করা। এমন একটি শান্তি যেটা মানুষকে এমন সব সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে যা অন্যেরা নিতে পারে না। অনেক সফল মানুষের সাফল্যের পেছনে ঠিক এই দক্ষতা থাকে। তারা কখনো তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেয় না। তারা কখনো চাপে নষ্ট হয় না। তারা কখনো উত্তেজনায় ভেসে যায় না। তারা জানে আমি যতক্ষণ ভেতর থেকে স্থির, ততক্ষণ বাইরে যা ঘটুক আমি পথ বদলাবো না। এখানে বইটি মনস্তত্ত্ব ব্যবহার করে বোঝায় আমাদের মস্তিষ্ক তিন সেকেন্ডের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেয় আমরা কি করব? কিন্তু একজন নিয়ন্ত্রিত মানুষ ওই তিন সেকেন্ডকে নিজের পক্ষে কাজে লাগায়। রাগ এলে সে তিন সেকেন্ড থামে। ভয় এলে তিন সেকেন্ড শ্বাস নেয়। আলসেমি এলে তিন সেকেন্ড নিজেকে প্রশ্ন করে এটা কি আমার ভবিষ্যতের মানুষটাকে সাহায্য করবে? আর এই তিন সেকেন্ডই সাধারণ মানুষ এবং অসাধারণ মানুষের পার্থক্য তৈরি করে। আরেকটি গভীর গল্প আছে। একজন যুবক তার জীবন গোছাতে পারছিল না। কাজে মন বসে না, সম্পর্ক ভালো না, নিজের উপর রাগ। সে প্রায়ই ভাবতো আমি কি কিছুই পারি না? একদিন সে একটি কথা শুনল যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সে নিজের ভবিষ্যৎকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। সে নিজের আচরণ পর্যবেক্ষণ শুরু করল। কখন সে ভেঙে পড়ে, কখন সে পিছিয়ে যায়, কখন সে মনোযোগ হারায়। তারপর সে প্রতিদিন একটি ছোট বিষয় নিয়ন্ত্রণ করার প্রতিজ্ঞা নিল। আজ ১০ মিনিট পড়বে, আজ ১৫ মিনিট হাঁটবে, আজ ফোনের স্ক্রোল পাঁচ মিনিট কমাবে। এই ছোট নিয়ন্ত্রণগুলো তাকে বদলে দিল। ছয় মাস পরে সে সেই মানুষ আর আগের মানুষ আর ছিল না, কারণ সে সময়কে নয়, নিজেকেই নিয়ন্ত্রণ করতে শিখল। বইটি বলে সেলফ কন্ট্রোল শুধু একটি দক্ষতা নয়, এটি আপনার ভবিষ্যতের নির্মাতা। যেদিন আপনি বুঝতে পারবেন যে আপনি আপনার চিন্তা, আচরণ, আবেগ এবং সিদ্ধান্তের মালিক, সেদিন আপনি বদলে যাবেন। আপনার ভেতরের নিয়ন্ত্রণ যত বাড়বে, তত আপনার জীবনের গতি পরিষ্কার হবে। বইটি যে বিষয়টি সবচেয়ে জোর দিয়ে বলে তা হলো জীবনের বড় সাফল্য বড় নিয়ন্ত্রণ থেকে আসে না, ছোট নিয়ন্ত্রণ থেকে আসে। দিনের শুরুতে ছোট সিদ্ধান্ত, দিনের শেষে ছোট আচরণ এবং প্রতিদিন ছোট উন্নতি। এই ছোট ছোট জিনিসগুলোই সবচেয়ে বড় বিজয় সৃষ্টি করে। আপনি যদি এই বইয়ের ধারণা নিজের জীবনে একটু একটু করে প্রয়োগ করতে শুরু করেন, আপনি দেখে অবাক হবেন আপনার জীবন ঠিক সেই দিকে হাঁটতে শুরু করবে যেদিকে আপনি সত্যিই যেতে চান। মানুষ ভাবে সেলফ কন্ট্রোল মানে শুধু নিজের ইচ্ছেকে চেপে রাখা। কিন্তু বইটি দেখায় এটি আসলে আপনার মনের অদৃশ্য চালক, যেটা ঠিক করে আপনি কতদূর যাবেন, কোথায় থামবেন আর কোথায় ভুল করবেন। এই অধ্যায়ে সেলফ কন্ট্রোলকে একটি অভ্যাস নয়, বরং মাইন্ড প্রোগ্রামিং হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কারণ আপনার মস্তিষ্ক নিয়মিত যেসব সংকেত পায়, আপনার আচরণ ঠিক সেগুলোর প্রতিক্রিয়া। তাই সেলফ কন্ট্রোল বাড়াতে প্রথম শর্ত হলো মস্তিষ্ককে নতুন সংকেত দেওয়া। এখানে বইটি একটি গভীর সত্য তুলে ধরে।











