Speaker A
যদি কোন মানুষকে এমন কিছু করার কথা বলা হয় যা পৃথিবী অসম্ভব বলে মনে করে, তাহলে বেশিরভাগ মানুষ কি করবে? তারা ভয় পেয়ে যাবে, অজুহাত দেখাবে, ভাগ্যকে দোষ দেবে অথবা বলবে যে এটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু ইতিহাসে প্রতিটি বড় পরিবর্তন তারাই এনেছেন যারা অসম্ভব শব্দটিকে কেবল একটি ভ্রম বলে মনে করেছেন। প্রত্যেক মানুষের ভেতরেই এমন এক শক্তি লুকিয়ে থাকে যা সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে অসম্ভবকেও সম্ভব করে তুলতে পারে। আর এই কথাই আমাদের শেখায় দা আর্ট অফ ইমপসিবল। এটি কেবল একটি বই নয়, বরং মানুষের সুপ্ত ক্ষমতাকে জাগ্রত করার সম্পূর্ণ ব্লুপ্রিন্ট। এই বইয়ের লেখক স্টিভেন কটলার জানান যে অসম্ভব কোন জাদু নয়, বরং এটি ছোট ছোট বৈজ্ঞানিক ধাপের ফলাফল। যদি কোন মানুষ সঠিক মাইন্ডসেট, সঠিক অনুপ্রেরণা এবং সঠিক পদক্ষেপ নিতে শেখে, তবে সে তার জীবনে এমন ফলাফল অর্জন করতে পারে যা সে কল্পনাও করেনি। এবার নিজের জীবনের দিকে তাকান। কতবার আপনি বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখেছেন? হয়তো ভেবেছেন সফল হতে হবে, টাকা কামাতে হবে, ফিট বডি তৈরি করতে হবে, ব্যবসা শুরু করতে হবে অথবা পরিবারকে ভালো জীবন দিতে হবে। কিন্তু কিছুদিন পরেই আপনার সেই উৎসাহ শেষ হয়ে গেছে। শুরুতে অনুপ্রেরণা ছিল, পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু তারপর অলসতা, ভয় এবং ডিস্ট্র্যাকশন আপনাকে থামিয়ে দিয়েছে। এজন্যই বেশিরভাগ মানুষ তাদের আসল সক্ষমতা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। তারা নিজেরাই নিজেদের সীমা নির্ধারণ করে ফেলে। কিন্তু এই বইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো মানুষের সীমা ফিক্সড বা নির্দিষ্ট নয়। আমাদের মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হতে পারে। আমাদের দক্ষতা উন্নত হতে পারে এবং আমাদের জীবনও পুরোপুরি বদলে যেতে পারে। ধরা যাক, রোহিত নামে একজন সাধারণ ছেলে আছে। রোহিত এক ছোট শহরে থাকে। তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। তার বন্ধুরা সারাদিন সময় নষ্ট করে এবং তার আশেপাশে এমন কেউ নেই যে তাকে বড় স্বপ্ন দেখার জন্য অনুপ্রাণিত করবে। কিন্তু রোহিতের ভেতরে স্বপ্ন আছে যে সে তার জীবন বদলাতে চায়। শুরুতে যখন সে তার স্বপ্নের কথা বলে, তখন মানুষ তার উপহাস করে। কেউ বলে এটা তোর দ্বারা সম্ভব নয়। কেউ বলে গরীব মানুষের এত বড় স্বপ্ন দেখা মানায় না। কিন্তু রোহিত যদি সেই কথাগুলো সত্যি বলে মেনে নিত, তবে তার গল্প সেখানেই শেষ হয়ে যেত। তবে সে সিদ্ধান্ত নিল যে প্রতিদিন সে নিজেকে একটু একটু করে উন্নত করবে। সে প্রতিদিন নতুন কিছু শেখা শুরু করল। নিজের মস্তিষ্ককে ট্রেইন করল। এবং ধীরে ধীরে তার আত্মবিশ্বাস বাড়তে লাগলো। কয়েক বছর পর সেই ছেলেটি তার শহরের মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠলো। এই গল্প শুধু রোহিতের নয়, বরং প্রত্যেক সেই মানুষের যারা নিজেদের জীবন বদলাতে চায়। এই বইতে প্রথমেই কথা বলা হয়েছে অনুপ্রেরণা বা মোটিভেশনের বিষয়ে। বেশিরভাগ মানুষ মনে করে অনুপ্রেরণা বাইরে থেকে আসে। কোন মোটিভেশনাল ভিডিও দেখে বা ভাষণ শুনে কিছুক্ষণ উত্তেজনা অনুভব করা। কিন্তু আসল অনুপ্রেরণা বাইরে থেকে আসে না, তা ভেতর থেকে জন্মায়। লেখক জানান, আপনার লক্ষ্য যদি আপনার হৃদয়ের সাথে যুক্ত থাকে, তবেই আপনি দীর্ঘ সময় ধরে পরিশ্রম করতে পারবেন। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি শুধু টাকা কামানোর জন্য কাজ করে, তবে কিছু সময় পর সে ক্লান্ত হয়ে পড়বে। কিন্তু সে যদি তার পরিবারের ভালো জীবন, তার স্বপ্ন এবং স্বাধীনতার জন্য কাজ করে, তবে তার ভেতরে সবসময় শক্তি থাকবে। তাই জীবনে সবচেয়ে জরুরি হলো আপনার কেন বা ওয়াই খুঁজে বের করা। যখন আপনার কেন মজবুত হয়, তখন কোন বাধাই আপনাকে আটকাতে পারবে না। এরপর বইতে ভয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ভয় মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু। বেশিরভাগ মানুষ ব্যর্থ হয় না কারণ তাদের মেধার অভাব আছে, বরং ব্যর্থ হয় কারণ তারা ভয়ের কারণে শুরুই করতে পারে না। তাদের ভয় লাগে, মানুষ কি বলবে? আমি হেরে গেলে কি হবে? আমি ব্যর্থ হলে কি হবে? কিন্তু সত্যি হলো প্রত্যেক সফল মানুষ কোন না কোন সময় ব্যর্থ হয়েছে। পার্থক্য শুধু এটাই যে তারা হাল ছেড়ে দেওয়ার পরিবর্তে শেখার পথ বেছে নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, মাইকেল জর্ডনকে তার স্কুলের বাস্কেটবল টিম থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। যদি তিনি সেদিন মেনে নিতেন যে তিনি ভালো খেলোয়াড় নন, তবে হয়তো পৃথিবী তাকে চিনতো না। কিন্তু তিনি তার দুর্বলতাকে নিজের শক্তি বানিয়ে নিয়েছেন। এই বইতে বারবার এটাই বোঝানো হয়েছে যে অসম্ভবকে সম্ভব করতে হলে আগে নিজের ভয়কে জয় করতে হবে। বইতে একটি খুব মজার কনসেপ্ট বলা হয়েছে, যাকে বলা হয় ফ্লো স্টেট। এটি সেই অবস্থা যখন মানুষ নিজের কাজে পুরোপুরি ডুবে যায়। সে সময় না ক্লান্তি লাগে, না সময়ের হিসাব থাকে। আপনি লক্ষ্য করেছেন যখন আপনি এমন কাজ করেন যা আপনার খুব পছন্দের, তখন ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যায়, কিন্তু আপনি বুঝতেই পারেন না। এটাই হলো ফ্লো স্টেট। লেখক বলেন, বিশ্বের সফল মানুষরা বারবার এই স্টেটেই কাজ করেন। কারণ এই অবস্থায় মস্তিষ্ক সবচেয়ে বেশি সৃজনশীল এবং উৎপাদনশীল থাকে। ধরুন একজন ছাত্র পড়াশোনায় খুব দুর্বল। সে ঘন্টার পর ঘন্টা বই নিয়ে বসে থাকে, কিন্তু মন লাগে না। অন্যদিকে সে যদি তার প্রিয় গেমটি খেলে, তবে ঘন্টার পর ঘন্টা কোন ক্লান্তি ছাড়াই খেলতে পারে। কেন? কারণ গেম খেলার সময় তার মস্তিষ্ক ফ্লো স্টেটে চলে যায়। এখন ভাবুন, যদি সে পড়াশোনা বা ব্যবসায় সেই ফ্লো স্টেট অর্জন করতে পারে, তবে তার জীবন কত দ্রুত বদলে যেতে পারে। এজন্য লেখক বলেন, নিজের কাজকে বাধ্যবাধকতা নয়, বরং নিজের পরিচয় বানান। এরপর বইতে ছোট ছোট উন্নতির শক্তির কথা বলা হয়েছে। বেশিরভাগ মানুষ জীবন বদলানোর জন্য বিশাল কোন পদক্ষেপ নিতে চায়। তারা ভাবে একদিনেই সব বদলে যাবে। কিন্তু আসল পরিবর্তন ধীরে ধীরে ঘটে। যদি আপনি প্রতিদিন মাত্র এক শতাংশ উন্নত হন, তবে কয়েক বছর পর আপনি সম্পূর্ণ নতুন মানুষে পরিণত হবেন। যেমন, যদি কেউ প্রতিদিন ৩০ মিনিট ব্যায়াম করে, নতুন কিছু শেখে এবং নিজের লক্ষ্যের জন্য সামান্য কাজ করে, তবে কিছু সময় পর তার জীবন বদলে যাবে। কিন্তু সমস্যা হলো মানুষ দ্রুত ফলাফল চায়। যখন দ্রুত সাফল্য পায় না, তখন তারা হাল ছেড়ে দেয়। লেখক জানান, সাফল্যের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো ধারাবাহিকতা, কনসিস্টেন্সি। অনুপ্রেরণা মাঝে মাঝে আসে, কিন্তু শৃঙ্খলা, ডিসিপ্লিন প্রতিদিন কাজ করে। ধরুন দুজন মানুষ আছে। প্রথমজন খুব মেধাবী কিন্তু অলস। দ্বিতীয়জন সাধারণ কিন্তু প্রতিদিন পরিশ্রম করে। কিছু সময় পর দ্বিতীয়জন প্রথমজনের চেয়ে অনেক এগিয়ে যাবে। কারণ জীবনে জিত সবসময় তাদেরই হয় যারা ধারাবাহিকভাবে পরিশ্রম করে। বইটি আরো শেখায় যে আমাদের পরিবেশ আমাদের চিন্তাধারাকে খুব প্রভাবিত করে। যদি আপনি এমন মানুষের সাথে থাকেন যারা সবসময় নীতিবাচক কথা বলে, স্বপ্ন নিয়ে উপহাস করে, তবে ধীরে ধীরে আপনিও তাদের মত হয়ে যাবেন। কিন্তু যদি আপনি এমন মানুষের সাথে সময় কাটান যারা আপনাকে অনুপ্রাণিত করে, পরিশ্রম করে, তবে আপনার চিন্তাধারাও বদলে যাবে। তাই জীবনে সঠিক মানুষের সঙ্গ খুব জরুরি। একটি বাস্তব উদাহরণ দেখুন। এলন মাস্ক যখন ইলেকট্রিক কার এবং রকেট বানানোর কথা বলেছিলেন, তখন পৃথিবী তাকে নিয়ে উপহাস করেছিল। মানুষ বলেছিল এটা অসম্ভব। কিন্তু তিনি অন্যের সীমাকে নিজের সীমা হতে দেননি। তিনি ধারাবাহিকভাবে শিখেছেন, ঝুঁকি নিয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই কাজ করে দেখিয়েছেন যাকে পৃথিবী অসম্ভব বলেছিল। বইটি আমাদের শেখায় যে অসম্ভব কেবল তাদের জন্যই যারা চেষ্টা করা ছেড়ে দেয়। এরপর লেখক জানান যে বড় লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু পরিশ্রম যথেষ্ট নয়, সঠিক দিকে পরিশ্রম করা প্রয়োজন। অনেকে সারাদিন ব্যস্ত থাকে, কিন্তু উন্নতি করে না। কারণ তাদের ফোকাস বিক্ষিপ্ত থাকে। তারা সবকিছুতে হাত দেয়, কিন্তু কোন একটি বিষয়ে মাস্টার হয় না। তাই বইতে বলা হয়েছে জীবনে বড় হতে হলে ডিপ ফোকাস শিখতে হবে। যখন একজন মানুষ একসময় কেবল একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজেই পূর্ণ মনোযোগ দেয়, তখনই সে অসাধারণ ফলাফল পায়। ভাবুন, যদি কেউ প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা মনোযোগ সহকারে নিজের লক্ষ্যে কাজ করে, তবে এক বছর পর সে কোথায় পৌঁছাবে? কিন্তু আজকের দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় সমস্যা মনোযোগ হারানো। সোশ্যাল মিডিয়া, মোবাইল এবং সারাক্ষণের বিনোদন মানুষের ফোকাস করার ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। তাই যে নিজের মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে, সেই সবার থেকে এগিয়ে যায়। বইতে আরো বলা হয়েছে যে অসম্ভবকে অর্জন করতে শরীর এবং মস্তিষ্ক উভয়েরই মজবুত হওয়া জরুরি। যদি আপনার শরীর দুর্বল হয়, ঘুম ঠিকমত না হয়, তবে আপনি দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে পারবেন না। তাই সফল মানুষরা নিজেদের স্বাস্থ্যের দিকে গুরুত্ব দেয়। তারা জানে আসল সাফল্য হলো শরীর, মন এবং জীবনের মধ্যে ভারসাম্য থাকা। ধরুন দুজন মানুষ একই স্বপ্ন নিয়ে কাজ করছে। প্রথমজন রাতে জেগে থাকে, শরীর চর্চা করে না এবং সবসময় চাপে থাকে। দ্বিতীয়জন নিয়মিত ব্যায়াম করে, ভালো ঘুমায় এবং মন শান্ত রাখে। কিছুদিন পর দ্বিতীয়জন বেশি শক্তি, বেশি মনোযোগ এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে এগিয়ে যাবে। তাই সাফল্য শুধু পরিশ্রমের খেলা নয়, এটি সঠিক লাইফস্টাইলেরও খেলা। লেখক আরো বলেন, জীবনে ঝুঁকি নেওয়া খুব জরুরি। বেশিরভাগ মানুষ নিরাপদ জীবন চায়। তারা এমন কাজ করে যেখানে ব্যর্থতার ভয় কম। কিন্তু সত্যি হলো বড় সাফল্য সবসময় কমফর্ট জোনের বাইরেই পাওয়া যায়। যদি আপনি সবসময় নিরাপদ থাকতে চান, তবে আপনার জীবনও সাধারণই থাকবে। যেমন একটি শিশু যখন হাঁটা শেখে, সে অনেকবার পড়ে। সে যদি পড়ে যাওয়ার ভয়ে চেষ্টা ছেড়ে দিত, তবে সে কখনোই হাঁটতে পারতো না। জীবনের ক্ষেত্রেও সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য পড়ে যাওয়া জরুরি। বইটি শেখায় যে অসম্ভব কোন এক মুহূর্তের কাজ নয়, বরং হাজার হাজার ছোট সিদ্ধান্তের ফল। প্রতিদিন যখন আপনি ভয়ের বিরুদ্ধে এগিয়ে যান, অলসতার বিরুদ্ধে কাজ কর...











